খনিজ পদার্থ ও লবণ
শরীর সুস্থ রাখতে হলে আমাদের দেহে খনিজ পদার্থ ও লবণ রাখতে হবে নির্দিষ্ট মাত্রায়। খনিজ পদার্থের কাজ প্রধানত:
(১) দেহের উপাদান গঠনে অংশ নেওয়া বা সাহায্য করা
(২) পেশী সংকোচনে ও স্নায়বিক আবেগে সাহায্য করা
(৩) বিভিন্ন এনজাইমকে সাহায্য করা।
(৪) জলীয় অংশের সমতা ও আম্রাবণের চাপ ঠিক রাখা। ফলে দেহের পানি শোষে, রক্তে ও কলায় সঠিক যাতায়াত করতে পারে।
এই খনিজ পদার্থ ও লবণ আমাদের সংগ্রহ করতে হবে প্রধানত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল থেকে। লবণ ও খনিজ পদার্থগুলির মধ্যে লোহা, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার ইত্যাদি একান্ত প্রয়োজন। এগুলি খাদ্যে উপস্থিত থেকে পরিপাক ও জৈবক্রিয়ায় সাহায্য করা।
ক্যালসিয়াম বা চূণ প্রয়োজন দাঁত ও হাড়ের সুদৃঢ় গঠনের জন্য, রক্ত জমাট বাঁধার জন্য। চূণ পাওয়া যায় দুধ, মাখনতোলা দুধ, ডাল, তিল, মাছ, ধনে ও ধনেপাতা থেকে। চূণ-এর অভাবে রিকেট, দাঁত ও হাড়ের বিভিন্ন অসুস্থ ও খর্বাকৃতি হয়। তেমনি লোহা আমাদের শরীরে বিশেষ প্রয়োজন। এটি হিমোগ্লোবিন বা লাল রক্তকণিকা গঠন করে। লোহা পাওয়া যায় টাটকা শাকসবজি, কল বেরুনো দানা শষ্য, ডিম, যকৃত ইত্যাদি থেকে। লোহার অভাবে রক্তশূন্যতা হয়।
কোন খনিজ পদার্থ ও লবণ কোন কাজে
(১) অস্থি, পেশী, স্নায়ু, রক্ত ইত্যাদি টিসু গঠনকারী :- ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লোহা, তামা, ম্যাঙ্গানীজ, সালফার।
(২) দেহের জলীয় অংশের সমতা রক্ষাকারী :- পটাসিয়াম, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন।
(৩) খাদ্য থেকে শক্তি মুক্তিদান করতে :- ফসফরাস, সালফার, আয়োডিন।
এক-নজরে লবণ কথা
খনিজ পদার্থ - প্রতিদিনের চাহিদা - শারীরবৃত্তীয় কাজ - কোথায় পাবেন
১. খনিজ পদার্থ - সোডিয়াম
প্রতিদিনের চাহিদা ৫-১০ গ্রাম
শারীরবৃত্তীয় কাজ - স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা, হৃৎপিন্ডে সংকোচন নিয়ন্ত্রণ, জলের বিশ্লেষণে সাহায্য করা।
যেথায় পাবেন - দুধ, ক্ষারজল, খাদ্যলবণ ইত্যাদি এবং বাদাম, শিম, শশা, প্রভৃতিতে।
২. খনিজ পদার্থ - ক্যালসিয়াম
প্রতিদিনের চাহিদা ১-২ গ্রাম
শারীরবৃত্তীয় কাজ - স্নায়ু ও পেশীর উদ্দীপনা, পেশী সঞ্চালন, অস্থি গঠন ইত্যাদি।
যেথায় পাবেন - দুধ, ডিম, লেবু, গাজর, পিয়ারা, শাকসব্জী, ক্ষারজল ইত্যাদিতে।
৩. খনিজ পদার্থ - পটাসিয়াম
প্রতিদিনের চাহিদা ২-৪ গ্রাম
শারীরবৃত্তীয় কাজ - স্নায়ুতন্ত্রের কাজ নিয়ন্ত্রণ, কাবর্ন-ডাই-অক্সাইড পরিবহণ, পেশী সংকোচন প্রতিহত করে।
যেথায় পাবেন - মটরশুঁটি, মধু, আলু, কপি, আঙুর এবং প্রায় সব খাদ্যদ্রব্যে।
৪. খনিজ পদার্থ - ফসফরাস
প্রতিদিনের চাহিদা ১.২ গ্রাম
শারীরবৃত্তীয় কাজ - রক্ততঞ্চন, পেশীসংকোচন, নিউক্লিওপ্রোটিন, ফসফোপ্রোটিন গঠন, উৎসেচন তৈরী ইত্যাদিতে সাহায্য করে।
যেথায় পাবেন - দুধ, মাংস, মাছ, ডিম, শাকসব্জী, শস্যদানা ইত্যাদিতে।
৫. খনিজ পদার্থ - লৌহ
প্রতিদিনের চাহিদা ১৫-২০ মিঃগ্রাঃ
শারীরবৃত্তীয় কাজ - রক্তের হিমোগ্লোবিন প্রস্তুত, অক্সিজেন পরিবহণ ও কলাশ্বসন ইত্যাদি।
যেথায় পাবেন - মসুরডাল, কাঁচকলা, শাকসব্জী, মাছ, ডিম, মাংস প্রভৃতি।
৬. খনিজ পদার্থ - ক্লোরিন
প্রতিদিনের চাহিদা ১৫-২০ গ্রাম
শারীরবৃত্তীয় কাজ - জলের ভারসাম্য রক্ষা, অম্ল-ক্ষারীয় সমতা রক্ষা, আয়নিক ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি।
যেথায় পাবেন - শাকসব্জী, সাধারণ লবণ, টমেটো, চীজ প্রভৃতিতে।
৭. খনিজ পদার্থ - আয়োডিন
প্রতিদিনের চাহিদা ০.০৫-০.১ মিঃগ্রাঃ
শারীরবৃত্তীয় কাজ - থাইরোট্রপিক হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ ও থাইরোক্সিন গঠন।
যেথায় পাবেন - শাকসব্জী, সামুদ্রিক মাছ, সাধারণ জল ইত্যাদিতে।
ভিটামিন কোথায় পাবেন, কেন খাবেন, কতটা দরকার ?
রাসায়নিক নাম - কোন কোন খাদ্যে পাওয়া যায় - অভাব হলে কী হয় ? - দৈনিক কত প্রয়োজন
১. ভিটামিন-এ (রাসায়নিক নাম রেটিনল)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - মাছ,হাঙর ইত্যাদির যকৃৎ
চর্বি, মাখন, তেল, সিদ্ধ ডিম, ভেটকি, মৃগেল, চিতল, ইলিশ পারসে, ট্যাংরা, ইত্যাদি মাছ। তাছাড়া দুধ, টমাটো, গাজর, বিট ও হলুদ তরকারিতে, বাঁধাকপি আম, পেঁপে, মটরশুঁটি।
অভাব হলে যা হয় - অস্থির বৃদ্ধি স্থিমিত হয়। টিস্যু কুঁচকে যায়, খুসকি হয়, চুল হয় রুক্ষ। লিউকোরিয়া, স্যানারিজম, নিম্নাঙ্গের পক্ষাঘাত, জেরোসিস,চোখের উজ্জ্বলভাব নষ্ট হয় কনজাংটাইভা,চোখের সাদা অংশ কুঁচকে যায় ও দাগ পড়ে কেরাটোম্যানিসরা-চোখের মণি গলে যায় জেরফথ্যালমিয়া-রাতকানা।
দৈনিক প্রয়োজন ২৫০০ - ৩০০০ আই, ইউ
২. ভিটামিন-বি (রাসায়নিক নাম ইনোসিটল)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - গম, সয়াবিন, ভুট্টা, গুড়, মেটে চিনেবাদাম, দুধ, অঙ্কুরিত ছোলা ডিমের কুসুম।অভাব হলে যা হয় - চুল ওঠা, অ্যানিমিয়া বেরিবেরি, পেলাগ্রা।
২.১. ভিটামিন বি-১ (রাসায়নিক নাম থায়ামিন)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - গম, চীনেবাদাম, মটর ডাল, সয়াবিন, যব, ভুট্টা, বাঁধাকপি, ডিমের কুসুম, মাংস, মাছের ডিম, পেঁয়াজ।
অভাব হলে যা হয় - অবসাদ, স্নায়ুর অসুখ, গ্রন্থিতে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বেরিবেরি।
দৈনিক প্রয়োজন ১-৮ মিলিগ্রাম
২.২. ভিটামিন বি-২ (রাসায়নিক নাম রিবোফ্লেবিন) যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - মেটে, ডিমের কুসুম, ছানার জল, মুখ ও জিভে ঘা, শুষ্ক দুধ, পালংশাক, মটর ডাল, সীম, ত্বক, চোখে আলোতে বিন, চীনাবাদাম, পোস্ত।
অভাব হলে যা হয় - মুখ ও জিভে ঘা, শুষ্ক ত্বক, চোখের আলোতে কষ্ট হয়, জিভের স্বাদ গ্রন্থির কাজ নষ্ট হয়।
দৈনিক প্রয়োজন ১.৫—১.৮ মিলিগ্রাম
২.৩. ভিটামিন বি-৩ (রাসায়নিক নাম প্যান্টোথেটিক অ্যাসিড)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - ডিমের কুসুম, যকৃৎ, গুড়, মাখন আলু, টোমাটো, রাঙা আলু।
অভাব হলে যা হয় - অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির কর্টিসোল হরমোন তৈরী ব্যাহত হয়, অকালে চুল পাকে।
দৈনিক প্রয়োজন ১০ মিলিগ্রাম
২.৪. ভিটামিন বি-৪ (রাসায়নিক নাম কোলিন)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - চাল, ফল, মাখন, দুধ, অঙ্কুরিত গম, ডিমের কুসুম ।
অভাব হলে যা হয় - বিষক্রিয়া নিবারণ করে।
দৈনিক প্রয়োজন ২০ মিলিগ্রাম
২.৫. ভিটামিন বি-৫ {রাসায়নিক নাম নায়াসিন (নিকোটিক অ্যাসিড)}
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - মাছ, মাংস, মেটে, অঙ্কুরিত গম চীনেবাদাম।
অভাব হলে যা হয় - মুখে ঘা ও দুর্গন্ধ হজমের গোলমাল,রক্তাল্পতা,পেলেগ্রা নামক চর্মরোগ,চামড়া খসখসে ভাব,স্মরণশক্তি হ্রাস।
দৈনিক প্রয়োজন ১২-১৮ মিলিগ্রাম
২.৬. ভিটামিন বি-৬ (রাসায়নিক নাম পাইরিডকসিন কলিকঅ্যাসিড)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - চাল, ডাল, ভুট্টা, গম, মাছ, ডিমের কুসুম, দুধ, যকৃৎ, মাংস, মেটে, মাছ, ফুলকপি,পালং শাক, হিঞ্চে শাক।
অভাব হলে যা হয় - অবসাদ চর্মরোগ,খিঁচুনি স্নায়ু দুর্বলতা, সায়াটিকা বৃদ্ধি হ্রাস পায়,গর্ভপাত রক্তাল্পতা।
দৈনিক প্রয়োজন ২ মিলিগ্রাম
২.৭. ভিটামিন-১২ (রাসায়নিক নাম কোবলামিন)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - ডিম, দুধ, যকৃৎ, মাংস, মাখন
৩. ভিটামিন-সি (রাসায়নিক নাম অ্যাসকরবিক অ্যাসিড)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - পাতিলেবু, বাতাবি, কমলা, মুসম্বি, পালংশাক, আঙুর, আম আনারস, পেঁপে, আমলকি,বাঁধাকপি, বকফুল, মুগ, লংকা।
অভাব হলে যা হয় - নিউমোনিয়া, অ্যালেমিয়া রক্ত জমাট বাঁধতে দরকার।
৪. ভিটামিন-ডি (রাসায়নিক নাম ক্যালসিফেরল)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - হাঙর, কড মাছের যকৃৎ তেল মাখন, ঘি, দুধ, ডিমের কুসুম, সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি।
অভাব হলে যা হয় - শিশুদের রিকেট বড়দের অষ্টিও-ম্যালেরিয়া। অষ্টিওপোরোসিস ক্যারিজা পায়রিয়া।
দৈনিক প্রয়োজন ৪০০ আই.ইউ
৫. ভিটামিন-ই
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - সয়াবীন, সবুজ তরকারি
অভাব হলে যা হয় - হাড়ের বৃদ্ধি হ্রাস, রক্তপাত বন্ধ না হওয়া।
দৈনিক প্রয়োজন ১৫-২০ মিলিগ্রাম
৬. ভিটামিন-এইচ (রাসায়নিক নাম ক্যারোটিন)
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - ডিমের কুসুম, দুধ, গুড়, টমাটো।
অভাব হলে যা হয় - চর্মরোগ, হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা, হজমের গোলমাল দুর্বল ফুসফুস।
৭. ভিটামিন-কে
যে যে খাদ্যে পাওয়া যায় - তেল, ডিম, দুধ, অঙ্কুরিত গম, ছোলা ও মুগ।
অভাব হলে যা হয় - জনন যন্ত্রের অসুখ
দৈনিক প্রয়োজন ৫ মিলিগ্রাম।
দ্রবনীয়তা অনুসারে ভিটামিনের ভাগ :
(১) স্নেহ পদার্থে দ্রবনীয় ভিটামিন : A, D, E, K
(২) জলে দ্রব্যনীয় ভিটামিন : B-Complex, C, P
ভিটামিন
প্রায় সকল খাদ্যেই অল্প-বিস্তর নানা প্রকারের ভিটামিন আছে। মূল খাদ্য উপাদানগুলি পরিপাক করে শক্তি মুক্ত করতে ভিটামিনের উপস্থিতি প্রয়োজন। এজন্য ভিটামিনকে বলা হয় খাদ্য প্রাণ।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url