সুষম খাদ্য তালিকা ও এর প্রয়োজনীয়তা
সুষম খাদ্য কি ?
আমাদের শরীরের পুষ্টি, ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধির জন্য এমন মিশ্র খাদ্য প্রয়োজন যাতে সম্মিলিত ভাবে পুষ্টি উপাদানগুলি সঠিক মাত্রায় যথোপযুক্ত হারে থাকবে। এই প্রকার খাদ্যকে সুষম খাদ্য বলে।
যদিও দেখা যায় দেশভেদে বা এই দেশের অঞ্চলভেদে খাদ্যের রকম ও ধরণ ভিন্ন যেমন কোন জায়গার প্রধান আহার বা খাদা ভাত কোথাও বা রুটি। কেউ হয়ত আমিষ পছন্দ করেন কেউ বা পূর্ণমাত্রায় নিরামিষাশী। খাদ্যের পুষ্টির মানদন্ডে এটি খারাপ কিছু নয়। তবে মনে রাখতে হবে প্রতিদিনের খাদ্যে সঠিক মাত্রায় শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ, খনিজ পদার্থ ও লবণ যেন থাকে।
মনে রাখবেন পেট ভরলেই পুষ্টি হয় না। কেউ হয়ত পেট ভরে একপ্রকার খাদ্যই দীর্ঘদিন ধরে আহার করে আসছেন তখনই হয় বিপদ দেহে আসে - অপুষ্টি। সেখান থেকে আবার বিভিন্ন রকম অসুখ-বিসুখ। শুধু অনাহার বা অর্দ্ধাহার থেকেই অপুষ্টি হয় না অসম ভারসাম্যহীন খাদ্য পরিকল্পনা বা আহার থেকে জন্ম নেয় অপুষ্টি ও বিভিন্ন ধরণের অসুখ।
দৈনিক সুষম খাদ্যে বিভিন্ন উপাদান কতটা, কি পরিমাণ থাকবে এ-বিষয়ে পুষ্টি বৈজ্ঞানিক মহলে বিভিন্ন পুষ্টি বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন মত পোষণ করেন। তবে সাধারণ ভাবে বলা যায় নিম্নলিখিত হারে খাদ্যের উপাদান থাকলে ভাল হয়।
তবে উপরোক্ত শতকরা এই হারটি আবার
(১) বয়স,
(২) কাজ বা শ্রমের ধরণ,
(৩) পুরুষ বা মহিলা,
(৪) ওজন,
(৫) উচ্চতার উপর নির্ভরশীল।
আবার গর্ভবর্তী নারীর ক্ষেত্রে একটু বিশেষ খাদ্য নির্ধারণ করতে হবে।
যেমন ধরুণ, যাদের শরীর বৃদ্ধির মুখে তাদের সুষম খাদ্যের সাথে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য কিছু বেশী দেওয়া দরকার, যেমন-শিশু, কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতীর ক্ষেত্রে।
আবার যারা শারিরীক পরিশ্রম বেশী করেন তাদের সুষম খাদ্যের সাথে অতিরিক্ত শর্করা ও ফ্যাট জাতীয় খাদ্য প্রয়োজন।
কিন্তু যারা অসুস্থ বা রোগী তাদের ক্ষেত্রে হবে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের, সেখানে কোন ধরনের খাদ্য বেশী পরিমাণ আবার কখন কখনও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়ে পড়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগমুক্তির জন্য।
প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের দৈনিক সুষম খাদ্য(গ্রাম হিসাবে)
প্রাপ্ত-বয়স্ক মহিলার সুষম দৈনিক খাদ্য। (গ্রাম হিসাবে)
সর্বনিম্ন সুষম খাদ্য
আপ রুচি খানা ?
'আপরুচি খানা, পর রুচি পরনা” বলে একটা কথা শুনতে পাওয়া যায়। কথাটা কতটা সঠিক তা বলা কঠিন, কিন্তু “আপ রুচি খানা” যেমন অতিরিক্ত ভাজা, মশলাযুক্ত খাবার, বেহিসাবি খাওয়া, যখন তখন খাওয়া বেশীকরে ফ্যাট ফুড খাওয়া ইত্যাদি করতে গিয়ে আমরা অবাঞ্ছিত অনেক রকম শারীরিক অসুবিধা (বিভিন্ন রকম ডিজেনারেটিড অসুখ) সাদরে আমন্ত্রন করছি।
আবার যদি বলা হয় ভাল দামী পুষ্টিকর খাবার খান, তা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ যে দেশের জনসাধারণ দুবেলা পেটভরে খেতে পায় না সেখানে এরূপ উপদেশ দেওয়া ব্যঙ্গ করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিন্তু আমরা যদি কিছু সাধারণ বিষয় মনে রাখি ও মেনে চলি তা হলে আমরা সাধারণ যে সকল খাদ্য গ্রহণ করি তার সম্পূর্ণ পৌষ্টিক মূল্য বা উপাদানগুলির পূর্ণ কাজে লাগাতে পারি। তাতে আমাদের সুফল সুনিশ্চিত।
মনে করে একটু মেনে চলুন
(১) ভাত সুসিদ্ধ করতে ঠিক যতটা জল দেওয়া প্রয়োজন ঠিক ততটা জল দিন। সাধারণত বলা হয় যতটা চাল তার দুই থেকে আড়াই গুণ জল দিলে ভাত সুসিদ্ধ হয়। কিন্তু তাতে ফ্যান থাকে না। ফ্যান ফেলে দিলে তার সাথে অনেক খাদ্য প্রাণ বা ভিটামিন খনিজ পদার্থ। বেরিয়ে যায়।
(২) সবজি সিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ঐ একই কথা। পরিমাপ মত জ্বলে সবজি ঢাকা দিয়ে সিদ্ধ করুন।
(৩) প্রয়োজনে ভাতের ফ্যান ও সবজি সিদ্ধ জল ফেলে না দিয়ে অন্য তরকারি রাঁধবার সময় ব্যবহার করতে পারেন। তাতে খাদ্যের পৌষ্টিকতা উপাদানের পূর্ণ ব্যবহার হবে।
(৪) সবজি বেশী না ভাজাই ভালো কারণ তাপের জন্য সবজির খাদ্যপ্রাণ অপচয় বা নষ্ট হয়।
(৫) শাক সবজির খাদ্য রান্না করুন। শাক রান্নার সময় আর জল না দেওয়াই ভালো, কারণ শাকে যা জলীয় অংশ থাকে তা সিদ্ধ হবার পক্ষে যথেষ্ট।
(৬) সবজির খোসা পাতলা করে ছাড়াবেন। কারণ অনেক পৌষ্টিক উপাদান ও খাদ্যপ্রাণ খোলার নীচে থাকে।
(৭) সবজি কেটে জলে ভিজিয়ে রাখবেন না। প্রথমে ভাল করে ধুয়ে নিন, তারপর বড় করে কেটে রান্না করুন। কেটে জলে ভিজিয়ে রাখলে অনেক খাদ্যপ্রাণ নষ্ট হয়। আবার বড় করে কাটলে রান্নার সময় বা পরে অনেক উপাদান বজায় থাকে।
(৮) খাদ্য সিদ্ধ করার জন্য ঠাণ্ডা জলের বদলে গরম জলে সিদ্ধ করুন।
(৯) রান্নার চিনি ব্যবহারের পরিবর্তে গুড় ব্যবহার করুন।
(১০) রান্নার খাবার সোডা ব্যবহার করবেন না। তাতে অনেক প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান নষ্ট হয় ।
(১১) সাধারণ রান্নায় টক দই, লেবুর রস, তেঁতুল জল প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন, তাতে রান্না যেমন মুখরোচক হয় তেমনি অনেক খাদ্যপ্রাণ সংরক্ষিত থাকে। হজমেও সুবিধা হয়।
(১২) খাদ্যে এক রকম শস্য খাওয়ার বদলে মিলিয়ে মিশিয়ে খেলে উপকার বেশী হয়। যেমন ভাত ও রুটি। তবে পরিমাণ এক রাখাই ভালো।
(১৩) একরকম ডাল ব্যবহার না করে সমগোত্রীয় দুই বা তিন রকম ডাল একইসাথে সিদ্ধ করে, রান্না করা যেতে পারে। তাতে পুষ্টির মান যেমন উন্নত হয়, তেমনি সুস্বাদু হয়।
(১৪) কিছু কিছু সবজি ফল আছে যা রান্না করলে তার খাদ্যপ্রান তাপ, হাওয়ার সংস্পর্শে নষ্ট হয়ে যায় বিশেষ করে ভিটামিন “সি”। - এরূপ খাদ্য যেগুলি কাঁচা খাওয়া যায় সেগুলি স্যালাড করে প্রধান খাদ্য গ্রহনের সময় খান। তাতে খাদ্য সহজে যেমন হজম হবে, তেমনি কোষ্ঠ পরিষ্কার করে।
(১৫) প্রধান খাদ্য গ্রহনের সময় সম্ভব হলে ঘরে পাতা টক দই বা টক দই এর ঘোল বা লস্যি খান। এতে ও খাদ্য হজম হয় ও খাদ্যের প্রোটিন মান অনেক বৃদ্ধি পায়।
(১৬) রোজ কিছু ফল খান, যা আপনার সামর্থ্যের মধ্যে।
(১৭) অতিরিক্ত ভাজা, তেল, ঘি, মাখন যুক্ত খাবার যতটা পারেন পরিহার করুন।



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url