খাদ্য ও পথ্য সম্পর্কে | জেনে নিন
খাদ্য ও পথ্য
প্রকৃতির অফুরন্ত খাদ্য ভাণ্ডার থেকে জীবজগৎ তার সহজাত প্রবণতায় বেছে নেয় তার জীবন ধারণের উপযোগী খাদ্য। যে খাদ্য একজনের কাছে উপযোগী সেই খাদাই হয়ত অপর জনের কাছে ক্ষতিকর। অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মানুষই বেশী বুদ্ধিমান তার জ্ঞানের সীমানাও বেশী। কয়েক হাজার বছরের অভিজ্ঞতার সাথে বৈজ্ঞানিক চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করে মানুষ জেনেছে বিভিন্ন খাদ্যের গুণাগুণ – কী খাদ্য খেলে সুস্থ থাকা যায়। আর কোন কোন খাদ্য তার পক্ষে অস্বাস্থ্যকর।
খাদ্য কি ?
সংজ্ঞা হিসাবে সংক্ষেপে বলা যায় যে সকল জিনিস বা দ্রব্য আহার করলে জীবদেহের ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধিসাধন, পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক শক্তি পাওয়া যায় তাকে আমরা খাদ্য বলি।
পথ্য কি ?
খাদ্য ও পথ্যর চুলচেরা সংজ্ঞা দেওয়া একটু কঠিন, তবু সাধারণভাবে সংজ্ঞা হিসাবে বলা যায় অসুস্থ ব্যক্তির বা রোগীর গ্রহণযোগ্য খাদ্যকে পথ্য বলে।
তবে সব খাদ্যই পথ্য নয়। পথ্য রোগ নিরাময়ের অন্যতম হাতিয়ার। সঠিক প্রয়োগে পথ্য ঔষধের মতই কাজ করে। বেশ কিছু অসুখ আছে যেমন—ডায়াবেটিস, বাত, মেদবৃদ্ধি, শীর্ণতা, খাদ্য অ্যালার্জি, হাঁপানি, নেফ্রাইটিস, উচ্চারক্তচাপ, অপুষ্টি জনিত অসুখ, হৃদযন্ত্রের অসুখ ইত্যাদিতে খাদ্য, পথ্য নির্বাচন অতি অবশ্যই একান্ত প্রয়োজন। সংক্ষেপে পথ্যের উদ্দেশ্য :-
(১) পুষ্টির মান ও শক্তি অর্থাৎ ক্যালরি বজায় রাখা।
(২) রোগ প্রতিরোধ-এ সাহায্য করা।
(৩) দেহ কোষ ও টিস্যুর ক্ষয়পূরণ করা।
(৪) সঠিক খাদ্য ও পথ্য নির্বাচন করে বিপাক ক্রিয়াকে সাহায্য করা।
(৫) প্রয়োজনে নির্দিষ্ট খাদ্য নিয়ন্ত্রন করে বিশেষ দেহযন্ত্রকে বিশ্রাম দেওয়া ও ঐ দেহযন্ত্রের উন্নতি সাধন করা।
পথ্যের রকমফের
পথ্য নানারকম হয়। রোগীর শারিরীক অবস্থা, রোগের প্রবণতা রোগের রকমফের, রোগীর আর্থিক সঙ্গতি পারিপার্শ্বিক অবস্থা ইত্যাদি বিচার বিবেচনা করে পথ্য নির্বাচন করা উচিত। পথ্যকে সাধারণত যে কয়ভাগে ভাগ করা হয়েছে সেগুলি হল :—
(১) সম্পূর্ণ জলীয় পথ্য :- এই প্রকার পথ্য জলীয় ভাগ খুব বেশী মাত্রায় থাকে। যেমন— মিছরির জল, গ্লুকোজ মেশান জল, বার্লির জল, ডাবের জল, ফলের রস, ছানার জল ইত্যাদি। জলীয় পথ্যে পুষ্টির উপাদান খুব কম মাত্রায় থাকে। রোগ ও রোগীর অবস্থা অনুযায়ী এ রকম পথ্য নির্বাচন করা হয়। আবার প্রয়োজন এর সাথে পুষ্টিকর উপাদান যোগ করা হয়। জলীয় পথ্য সাময়িক ভাবে সাধারণত ১/২ ঘণ্টা অন্তর দেওয়া হয়।
(২) তরল পথ্য :- সম্পূর্ণ জলীয় পথ্যে পুষ্টির চাহিদা মেটে না। তরল পথ্যে পুষ্টির চাহিদা কিছুটা পূরণ হয়, যেমন:- দুধ, মাটা তোলা দুধ, ঘোল, ফলের রস, মাছের সূপ, সবজির সূপ, মাংসের সূপ বা মাছ, সবজি, মিশ্রিত সূপ, দুধ-ডিম মিশ্রিত কাষ্টার্ড ইত্যাদি তরল পদার্থ। কোন কোন ক্ষেত্রে এর সাথে আরও কিছু হালকা উপাদান যোগ করা যেতে পারে। এ জাতীয় পথ্য সাধারণত ৩/৪ ঘণ্টা অন্তর দেওয়া হয়।
(৩) অর্দ্ধ তরল পথ্য :- সুজি ও দুধ, সুসিদ্ধ ভাত এর মণ্ড ও দুধ, চিড়া সিদ্ধ ও দুধ, ডিম-দুধ, পাউরুটির সাদা অংশ ও দুধ ইত্যাদি ভাল করে মিশ্রণ পদার্থ বা খাদ্যকে অর্দ্ধ তরল পথ্য বলা হয়।
(৪) নরম পথ্য : ভাজাভুজি বর্জিত, সবজি ও দানাশস্যের খোসা ছিবড়াবিহীন সুষম খাদ্য সুসিদ্ধ করে রাঁধা পদার্থ বা খাদ্যকে নরম পথ্য বলে।
(৫) অবশেষ হীন পথ্য : যে সকল খাদ্য গ্রহনের পর সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে অবশোষণ হয়, বিশেষ কিছু অবশিষ্ট থাকে না। তার যদি সামান্য কিছু অবশিষ্ট থাকে তা অন্ত্রের গা দিয়ে জল আকারে নিসৃত হয় এরূপ খাদ্যকে অবশেষহীন পথ্য বলে। যেমন—সুসিদ্ধ মাছের সূপ, মাংসের সূপ, ম্যাস্ট সবজির সূপ, পাউরুটির সাদা অংশ, মিহি চালের সুসিদ্ধ ভাত, সুসিদ্ধ চিড়া, সুসিদ্ধ ডিম, অবশেষহীন পথ্য। এরূপ পথ্য অন্ত্রকে উত্তেজিত করে না কিন্তু পুষ্টির চাহিদা মেটায়।
(৬) উচ্চক্যালরি যুক্ত পথ্য : বিশেষ কিছু অসুখে উচ্চক্যালরি যুক্ত পথ্যের বিশেষ প্রয়োজন হয়। নচেৎ রোগমুক্তিতে ব্যাঘাত ঘটে। সাধারণত: ৩৫০০ - ৪০০০ ক্যালরি যুক্ত খাদ্যকে উচ্চক্যালরি যুক্ত পথ্য বলে। এরূপ খাদ্য যে কোন রকম হতে পারে যেমন তরল, অর্দ্ধ তরল, নরম, আবশেষ হীন ইত্যাদি। তবে এরূপ খাদ্য পথ্যে বেশী তৈলাক্ত পদার্থ অর্থাৎ তেল, ঘি, মাখন ইত্যাদি কখনই থাকবে না। যদিও ফ্যাট এ বেশী ক্যালরি পাওয়া যায় তবু বেশী তৈলাক্ত পদার্থ খিদের ভাবে কমিয়ে দেয়। এরূপ ক্ষেত্রে শর্করা জাতীয় খাদ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হয়।
(৭) অনুত্তেজক পথ্য : যে সকল খাদ্য পথ্য অন্ত্রকে উত্তেজিত করে না ও প্রায় অবশেষহীন এরূপ খাদ্যকে অনুত্তেজক পথ্য বলে। যেমন— দুধ, ডিম, মাখন, মিহি চালের সুসিদ্ধ ভাত, খোসা ছাড়ান সুসিদ্ধ আলু, তৈলাক্ত সুসিদ্ধ মাছ ইত্যাদি।
(৮) প্রোটিন নিয়ন্ত্রিত পথ্য : বিশেষ কিছু অসুখে যেমন কিডনীর বিভিন্ন অসুখে প্রোটিন নিয়ন্ত্রিত পথ্যের বিশেষ প্রয়োজন, নচেৎ রোগমুক্তি সম্ভব নয়। কিন্তু দৈনিক ক্যালরি ও পুষ্টি পূরণে সক্ষম এরূপ খাদ্য বা পথ্যও বিশেষ প্রয়োজন।
এরূপ ক্ষেত্রে দুধ, সুসিদ্ধ ভাত, মাখন, ফলের রস, গ্লুকোজ, রুটি, মধু, পাউরুটি, ফল ইত্যাদি দিয়ে দৈনিক ক্যালরি ও পুষ্টি পূরণ করা হয়। এসকল খাদ্য বা পথ্যকে প্রোটিন নিয়ন্ত্রিত পথ্য বলে। এরূপ ক্ষেত্রে সাধারণত ২০ থেকে ৪০ গ্রাম প্রোটিন পথ্যে যোগ করার কথা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন।
(৯) উচ্চপ্রোটিন যুক্ত পথ্য :- সুষম খাদ্যের সঙ্গে দৈনিক ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম প্রোটিন পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত মাছ, ডিম, মাংস, ডাল, সয়াবিন, বাদাম, মটর, বীন, রাজমা যুক্ত খাদ্যকে উচ্চ প্রোটিন যুক্ত পথ্য বলে।
(১০) শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট নিয়ন্ত্রিত পথ্য :- বিশেষ কয়েক প্রকার অসুখে যেমন মেদতায়, ডায়াবেটিস রোগে শর্করা নিয়ন্ত্রিত পথ্যের বিশেষ প্রয়োজন। আবার ক্যালরির হার সুনির্দিষ্ট ভাবে সীমায়িত রাখাও জরুরী। হ্রাসযুক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রিত খাদ্য বা পথ্যকে শর্করা নিয়ন্ত্রিত পথ্য বলে।
(১১) ফ্যাট নিয়ন্ত্রিত পথ্য :— চর্বিহীন মাছ-মাংস, মাখন, তেল, ঘি, বর্জিত খাদ্যকে ফ্যাট নিয়ন্ত্রিত পথ্য বলে।
পিত্তকোষ বা গল ব্লাডার এর অসুখে জণ্ডিসে, কোলাইটিস, আমাশা, পেটের অসুখে, মেদতায়, হৃদযন্ত্রের অসুখে, ফ্যাট নিয়ন্ত্রিত পথ্যের প্রয়োজন।
ফলে - সুফল
আধুনিক সভ্যতায় আমাদের মত উন্নয়শীল দেশের মানুষ শিখল বা রপ্ত করল পাশ্চাত্য ধরনের মিহি, পরিশ্রুত (Refine) খাদ্য গ্রহণ। কাঁচা ফল মূল সবজি সরে গেল তার খাদ্য তালিকা থেকে অনেক অনেক দূরে। সঙ্গে সঙ্গে এল আমাদের দেহে ভিটামিন অভাব জনিত নানা রকম অসুখ-বিসুখ ।
শুনে হয়ত অবাক হবেন ফলে আছে নানা রকম রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা যা নিয়মিত খেলে রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাই হয়ত আমাদের আর্য ঋষিরা ফল-মূল বেশী খেতেন, তাঁরা ফলমূল আহারের উপর মানুষকে বেশী জোর দিতেন। যাতে পুষ্টি, শক্তি, দুই-ই পাওয়া যায়।
আমরা অনেকে টনিক খেয়ে থাকি সুস্বাস্থ্যের জন্য। সত্যিকথা বলতে কি শারীরিক বিশেষ কয়েকটি অসুস্থতায় টনিক হয়ত দরকার - তাও সাময়িক কিন্তু টনিক খেয়ে কোন সুফল এর সম্ভাবনা নেই। প্রয়োজন নেই কোন ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ার। তার চেয়ে ঐ মূল্যের যদি কোন ফল খাওয়া যায় তাতে সু-ফল বেশী, মূল খাদ্যের সাথে ফল খেলে তা সহজে হজম হয়, আবার কোষ্ঠকাঠিন্য, হৃদযন্ত্রের অসুস্থতা, কোলষ্টরল ইত্যাদি নিরাময়ে কাজে লাগে। ফল Non-Toxic তাই ফলাহারীর শরীর বিষ বা টক্সিন মুক্ত, ফল রক্তে অম্ল ক্ষারের সমতা রাখে, শরীরে লবণ ও ভিটামিনের যোগান দেয় - শরীর থাকে সুস্থ। বাড়তি টনিক বা ভিটামিন ক্যাপসুল খাবার দরকার নেই। মিলিয়ে মিশিয়ে শাক সবজি ফল খেলেই চলে - তাতে আমাদের শরীরে যেটুকু ভিটামিন, লবণ ইত্যাদি প্রয়োজন তা পূরণ হয়ে যায়।
ছিবড়া, ছিবড়া নয়
ফুড ফাইবার (Food fiber) বা খাদ্য ছিবড়া সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন কেবল মনে পড়ছে –
যে অসুখগুলির কথা বলা হল, সেগুলিকে বলা যায় আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির (Diseases of modern civilization) ফসল ।
খাদ্য ছিবড়া বলতে বলা যায় খাদ্যের এমন একটি উপাদান যা আমরা হজম করতে পারি না – কিন্তু সু-স্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যে এদের উপস্থিতি একান্ত দরকার। যেমন--
Bran, Cellulose, Polysaccharides, Mucilage, Gums, Li- guin, Hemicellulose, Pectius.
সেজন্য যে সকল ফল, সবজি কাঁচা খাওয়া যায় তা প্রত্যেকদিন খাদ্যের মধ্যে রাখা উচিত। যেমন— আপেল, কমলালেবু, মুসাম্বি, কলা, গাজর, পেয়ারা, বাতাবিলেবু, লেটুস পাতা, ধনে পাতা, শালগম ইত্যাদি। আর যেগুলি খোসা ছাড়িয়ে আমরা খাই তার খোসা পাতলা করে ছাড়ানো উচিত। তাতে খাদ্যের ভিটামিন ও পুষ্টিমান সম্পূর্ণ বজায় থাকে আবার ছিবড়ার উপযোগীতা পাওয়া যায়।
• আমি নিরোগ মানে এই নয় আমি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। সুস্বাস্থ্য মানে পরিপূর্ণভাবে জীবন ভাল লাগার অনুভূতি। আমি মনে-প্রাণে ভাল আছি। এ-কথা মনে-প্রাণে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বলা। কেবলমাত্র রোগ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি বা মুক্ত থাকা নয়। সুস্বাস্থ্য অর্থে দেহ, মন, অনুভূতি, সহানুভূতি, আবেগ, ভালবাসা ও আত্মার একসাথে ভাললাগার এক সুর।
• ভাত সুসিদ্ধ করতে ঠিক যতটা জল দেওয়া প্রয়োজন ঠিক ততটা দিন। যতটা চাল তার দুই থেকে আড়াই গুণ জল দিলে ভাত সুসিদ্ধ হয়।
• ভাতের ফ্যান ফেলে দিলে অনেক খাদ্য প্রাণ বা ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ বেরিয়ে যায়। ফ্যান ভাতে শুকনো করে নিন।
• ভাতের ফ্যান ডাল বা অন্য কিছুতে মিশিয়ে দিন।
• পরিমাণ মত জলে ঢাকা দিয়ে আনাজ ও সবজি সিদ্ধ করুন।
• সবজি বা আনাজ সিদ্ধ জল ফেলে দেবেন না। রান্নায় ব্যবহার করুন।
• সবজি বেশী না ভাজাই ভালো। কারণ তাপের জন্য সবজির মধ্যের খাদ্যপ্রাণ নষ্ট হয়।
• রান্নায় খাবার সোডা ব্যবহার করবেন না। তাতে খাদ্যপ্রাণ নষ্ট হয়।
• অল্প আঁচে রান্না করুন।



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url