মানব মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান নিউরন সম্পর্কে জেনে নিন

বিচিত্র আমাদের এই জগত। কত রকমের প্রাণী এই জগতে। কত রকমের স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচর,পাখি। সমস্ত প্রাণীরই মস্তিষ্ক আছে। কিন্তু এদের সবার থেকে আলাদা মানুষের মস্তিষ্ক। অবশ্য মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বড় আকারের নয়, কিন্তু কার্যকারিতার দিক থেকে এর সমকক্ষ কেউ নেই। অন্যান্য প্রাণীদের মস্তিষ্কের সাথে মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান পার্থক্য হলো কল্পনা, কথা বলার ক্ষমতা এবং বিভিন্ন রকমের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। আর  এই মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান কি জানেন? নিউরন। তাই এই বিষ্ময়কর মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান নিউরন সম্পর্কে জানতে আগ্রহ থাকলে লেখাটি সম্পূর্ণ পড়ে ফেলুন.......

মানব মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান নিউরন সম্পর্কে জেনে নিন

পেজ সূচিপত্রঃ

মানব মস্তিষ্কের কাজ:

শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্পন্দন-এর হার, শ্বাসকার্য। দেখে, শুনে, ছুঁয়ে, স্পর্শ করে, স্বাদ নিয়ে মানুষ কত রকমের তথ্য আহরণ করে। মস্তিষ্ক সেই সমস্ত তথ্য গ্রহণ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করে। মানুষের হাঁটা, চলা, দৌড়ানো, কথা বলা, শোয়া, বসা এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। চিন্তা, চেতনা, নানা রকমের আবেগ এর আধার এটি।

এতসব প্রভূত পরিমাণ কাজ নিয়ন্ত্রণ, সমন্বয় সাধন করে। মানুষের মস্তিষ্ক, যেটির আকার ছোট একটি ফুলকপির মতই। কি করে সম্ভব এত স্বল্প পরিসরে এত ব্যাপ্তি। কি করে মস্তিষ্ক এসব করে। এই ফুলকপির মতো দেখতে কুঁচকানো মস্তিষ্ক, যাকে আমরা চলতি কথায় ঘিলু বলি এবং তার সাথে সুষুম্নাকান্ড এবং তাদের সংশ্লিষ্ট। স্নায়ুতন্ত্র: এগুলো মিলেই তৈরী করেছে অবিশ্বাস্য রকমের জটিল এবং নিরবিচ্ছিন্ন এই Information Processing System । যাকে বলা হয় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম (Central Nervous System)। আমাদের সমস্ত সচেতন, এমনকি অসচেতন ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের আধার এটি।

মানব মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান হল নিউরন । মস্তিষ্কে মোট ১০ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ বা নিউরন থাকে। এই কোষগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে। দুটি বা ততোধিক নিউরনের সংযোগস্থলকে বলে সিন্যাপস, যেখানে এদের সংকেত বিনিময় হয়। মূলত একটি নিউরনের অ্যাক্সন এবং অপর একটি নিউরনের ডেনড্রাইটের মিলনস্থলকে সিন্যাপস বলে। মানুষের কর্টেক্সে মোটামুটি ১০,০০০ এর মত সিন্যাপস থাকে।

নিউরনের গঠন

শরীরের গঠনমূলক একক হলো কোষ। অর্থাৎ, বাড়ি তৈরী হয় যেমন একটা একটা ইট দিয়ে। যেকোনো প্রাণীর শরীর তৈরী তেমনি কোষ দিয়ে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র-এর গঠনমূলক এককও হলো কোষ। তবে শরীরের অন্যান্য অংশের কোষের সাথে এর একটু পার্থক্য আছে। এমনিতে গঠনগত দিক থেকে বা চারিত্রিক দিক থেকে তেমন কোনো পার্থক্য নেই কিন্তু সাধারণ কোষ থেকে আচার আচরণের দিক থেকে অনেক তফাৎ আছে। বিশেষ ধরনের তড়িত-রাসায়নিক সংবহনতা-ই এদের আলাদা করে তুলেছে। তাই স্নায়ুকোষের নাম আলাদাই দেয়া হয়েছে যাকে বলা হয় নিউরন (Neuron)।

১০ বিলিয়ন নিউরন দিয়ে তৈরী কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। এই নিউরনগুলো তড়িত রাসায়নিক সংকেত আহরণ এবং সংবহনের মাধ্যমে এরা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ তৈরী করে একটি নিরবিচ্ছিন্ন এবং একক সংশ্লেষণ কেন্দ্র তৈরী করতে সক্ষম।

নিউরন ৩টি প্রাথমিক অংশ দিয়ে তৈরী:

• সেল বডি (Cell Body): 

এটি নিউরনের প্রধান অংশ। এর মধ্যেই থাকে নিউক্লিয়াস (Nucleus),এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকিউ (Endoplasmic Reticulum), রাইবোজ (Ribosome)। সেল বডি নষ্ট হয়ে গেলে নিউরনের মৃত্যু ঘটে।

● অ্যাক্সন (Axon): 

সেল বডি থেকে বেরোনো লেজ এর মতো অংশটাকে বলা হয় অ্যাক্সন। এই অংশটা নিউরনের “ইলেকট্রিক্যাল তার” এ মতো কাজ করে। অর্থাৎ এর মধ্যে দিয়েই ইলেকট্রোকেমিক্যাল সংকেত আসা যাওয়া করে। কারেন্ট এর তারের উপর যেমন রবারের আবরণ দেয়া থাকে ইনসুলেশন-এর জন্য, এর উপরেও তেমনি একটা আবরণ দেয়া থাকে যাকে বলা হয় মায়োলিন শিথ (Myelin Sheath)।

মায়োলিন শিথ অবশ্য রবারের তৈরী নয়। এটি ফ্যাট ও প্রোটিন দিয়ে তৈরী। আর এর কাজ ইনসুলেশন করাও নয়। এর কাজ হলো অ্যাক্সনের মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রোকেমিক্যাল সংকেত এর আনাগোনা দ্রুত করা। সব ধরনের কোষের অ্যাক্সনে অবশ্য মায়োলিন শিখ থাকেনা। যেসব নিউরনের অ্যাক্সন অনেকটা লম্বা হয়, তাদের উপরেই এই আবরণ থাকে ।

• ডেনড্রাইটস (Dendrites):

 শিকড়-এর মতো দেখতে এই অংশটি নিউরনগুলোর মধ্যে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ রাখতে সাহায্য করে। এটি অ্যাক্সনের শেষে বা সেল বড়ির গায়েও থাকতে পারে।

নিউরনের প্রকারভেদ:

আকারভেদে নিউরন নানা রকমের হয় যেমন: আমাদের আঙ্গুলের ডগায় যে সেনসরি নিউরন থাকে সেগুলোর অ্যাক্সন বাহু পর্যন্ত লম্বা হয়, আবার মস্তিষ্কের ভেতরে যেসব নিউরন হয় তাদের দৈর্ঘ্য মাত্র কয়েক মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। তবে নিউরনের প্রকারভেদ করা হয় সাধারণত সেগুলোর কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ কোনটা কি কাজ করে ।

কার্যভেদে নিউরনের প্রকারভেদ:

• সেনসরি নিউরন (Sensory Neuron): 

শরীরের বাইরের অংশ (যেমন: ত্বক) থেকে উদ্দীপনা বা সংকেত বহন করে নিয়ে যায় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে।

• মোটর নিউরন (Motor Neuron): 

এর কাজ সেনসরি নিউরন-এর ঠিক উল্টা। অর্থাৎ এরা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে আদেশমূলক সংকেত বহন করে নিয়ে যায় শরীরের বাহ্যিক অংশে (যেমন: পেশিতে, ত্বকে, গ্ল্যান্ডে) ইত্যাদি।

• ইন্টারনিউরন (Interneuron): 

এর কাজ অন্যান্য নিউরনের মধ্যে যোগাযোগকারী হিসেবে কাজ করা। এদের দেখা যায় ব্রেন আর সুমাকান্ডের অংশে ।

এই সমস্ত নিউরন মিলে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজন মতো বিভিন্ন রকমের (ছোট, বড়, সরল, জটিল) নেটওয়ার্ক তৈরি করে।


আরো পড়ুনঃ

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ১

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ২

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ৩

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ৪