স্ট্রোক হয়েছে কিনা তা বোঝার সহজ উপায় || জেনে নিন
মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার ফলে যে অবস্থার দ্রুত জন্ম নেয় তাকে স্ট্রোক (Stroke) বলে। এই লেখাটি পড়ে আপনি খুব সহজে স্ট্রোক রোগের বর্ণনা,স্ট্রোক রোগের প্রকারভেদ,স্ট্রোক রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ,স্ট্রোক রোগে সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখা যায়,স্ট্রোক রোগের ঝুঁকি বাড়ার কারণ,স্ট্রোক রোগ নির্ণয়,স্ট্রোক হয়েছে কিনা তা বোঝার উপায়,স্ট্রোক রোগীদের জন্য সতর্কতা,স্ট্রোক রোগের জন্য চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। স্ট্রোক রোগ সম্পর্কে জেনে আগে সচেতন হয়ে চলতে এখুনিই লেখাটি পড়ে ফেলুন....
পেজ সূচিপত্রঃ
স্ট্রোক রোগের বর্ণনা (Stroke Description)
মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার ফলে যে অবস্থার দ্রুত জন্ম নেয় তাকে বলা হয় স্ট্রোক (Stroke)। দেহের রক্তের মাত্র ২% মস্তিষ্ক ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু মস্তিষ্কের কোষসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল । অক্সিজেন সরবরাহে সমস্যা হলে দ্রুত এই কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এই কোষগুলো শরীরের যেই অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ওই অংশগুলো পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে যেতে পারে।
স্ট্রোক রোগের প্রকারভেদ (Classification)
ইসকেমিক (Ischemic) স্ট্রোক। (যা আঞ্চলিকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়াকে বোঝায়)।
হেমোরেজিক (Hemorrhagic) স্ট্রোক। (যা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণকে বোঝায়)।
স্ট্রোক রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ (Symptom & Sign)
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ কিংবা আঞ্চলিকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া এই দুই অবস্থা-ই স্ট্রোক-এর আওতায় আসে। রোগীরা দু'অবস্থাতেই প্রায় একই ধরনের উপসর্গ বা লক্ষণ (Signs & Symptoms) নিয়ে আসতে পারে। তবে রোগীর অবস্থা কতটা খারাপ তা নির্ভর করে মস্তিষ্কের অঞ্চলসমূহের কোন এলাকায় রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটলো তার উপর, কতটা এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হল এবং কত দ্রুত ওই অঘটন ঘটে থাকে তার উপর।
স্ট্রোক রোগে সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখা যায়ঃ
- মাথা ঘুরানো।
- হাঁটতে অসুবিধা হওয়া।
- ভারসাম্য রক্ষার অসুবিধা হওয়া।
- কথা বলতে সমস্যা হওয়া।
- অবশ হওয়া।
- দুর্বলতা।
- শরীরের এক পাশ অকেজো হওয়া।
- চোখে ঘোলা লাগা ।
- অন্ধকার লাগা বা ডাবল দেখা।
- হঠাৎ খুব মাথাব্যথা।
স্ট্রোক রোগের ঝুঁকি বাড়ার কারণ (Causes)
হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণগুলো মোটামুটি একই, যেমন-
- উচ্চ রক্তচাপ।
- বেশি কোলেস্টেরল।
- ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ।
- ধূমপান।
- স্থুলতা।
- মদ্যপান।
- পারিবারিক ইতিহাস।
দেখা যায় যে, স্ট্রোক সাধারণত ৫৫ বছররে উপর বয়স্ক পুরুষদের বেশি হয়।
স্ট্রোক রোগ নির্ণয় (Diagnosis)
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক একটি ভয়ানক জরুরি অবস্থা (Critical condition) এবং তা যদি মস্তিষ্কের অতীব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘটে, তবে তা দ্রুত রোগীর জীবনাবসানের কারণ হয়।
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ (Uncontrolled High Blood Pressure),
বহুমূত্র (Diabetes),
মাথায় তীব্র আঘাত (Severe Head Injury ) ছাড়াও কতিপয় জন্মগত কারণ যেমন:
ধমনির দেয়ালের দুর্বল অংশ ফেঁটে যাওয়া (Ruptured Aneurysm),
ধমনি-শিরার ভেতর অস্বাভাবিক সংমিশ্রণ, ইত্যাদি থেকে রক্তক্ষরণ (Bleeding from Arteriovenous malformation) সচরাচর ঘটে থাকে।
রোগ নির্ণয়ে দ্রুত ব্যবস্থা অতীব জরুরি। কেননা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর কোষগুলো ফুলে উঠতে শুরু করে, মস্তিষ্ক করোটি বা স্কাল চারিধার থেকে প্রায় বদ্ধ, বিধায় আক্রান্ত মস্তিষ্ক দ্রুত জটিলতার শিকার হয়। মস্তিষ্ক হারনিয়েশন (ইংরেজি: Hernia) হচ্ছে এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, অর্থাৎ দুর্বল অংশ গলিয়ে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বের হয়ে আসে এবং রোগী দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ধমনি বা শিরাবাহিত জমাটবাঁধা রক্তপিন্ড (Embolus) মস্তিষ্কের কোন এলাকায় রক্ত সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটালে জন্ম নেয় অপর প্রকার স্ট্রোক-রক্ত চলাচল শূন্য অকার্যকর মস্তিষ্ক বা সেরিব্রাল ইনফার্কশন (Cerebral Infarction)। এক্ষেত্রেও রোগ নির্ণয় দ্রুত প্রয়োজন। জমাটবাধা রক্ত অম্বুরকে দ্রুত ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব এবং এজন্য শল্য চিকিৎসক মাত্র ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় পান।
স্ট্রোক হয়েছে কিনা তা বোঝার উপায়
- শারীরিক পরিমাপ
- ব্রাড প্রেসার মাপা।
- রক্তে কোলেস্টেরল মাপা।
- ডায়াবেটিস মাপা।
- অ্যামাইনো এসিড মাপা।
- আলট্রাসাউন্ড
- ঘাড়ের আর্টারির ছবি নিয়ে দেখাতে হবে যে কোথাও রক্তনালি সরু কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে কিনা।আর্টারিওগ্রাফি (Arteriography)
- রক্তনালিতে এক ধরনের রং প্রবেশ করিয়ে Xray করানো, এতে রক্ত চলাচলের একটা ছবি পাওয়া যায়।
- CT scan (Computerized Tomography scan)
- মস্তিষ্কের 3D স্ক্যান করা যায়।
- MRI (Magnetic Resonance Imaging) মস্তিষ্ক কলার কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কিনা তা এমআরআই (চুম্বকক্ষেত্র তৈরি করে) দেখার চেষ্টা করা হয়।
- ইকোকার্ডিওগ্রাফি Echocardiography-তে আলট্রাসাইড ব্যবহার করে হৃদপিন্ডের একটা ছবি তুলে দেখা হয় কোনো জমাট রক্ত, বুদ বুদ কিংবা অন্যকিছু (embolus) রক্ত চলাচল বন্ধ করছে কিনা।
স্ট্রোক রোগীদের জন্য সতর্কতা (Precaution)
স্বাস্থ্যসম্মত জীবন ব্যবস্থা যদি বজায় রাখা যায় তাহলে অনেকখানি ঝুঁকি কমানো যায়ঃ
- ব্লাড প্রেসার জানা এবং কন্ট্রোল করা।
- ধূমপান না করা।
- কোলেস্টেরল এবং চর্বি জাতীয় খাবার না খাওয়া।
- নিয়ম মাফিক খাবার খাওয়া।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা।
- নিয়ম করে হাঁটা বা হালকা দৌড়ানো।
- দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করা।
- মাদক না নেয়া।
- মদ্যপান না করা।
স্ট্রোক রোগের চিকিৎসা (Treatment)
ইস্কেমিক স্ট্রোকের চিকিৎসা করতে হলে অবশ্যই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে হবে না জমাটবাঁধা রক্ত ভেঙ্গে তরল করতে হবে। প্রাথমিকভাবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এরপর CT Scan,ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (MRI) এর মাধ্যমে স্ট্রোকের মাত্রা সম্পর্কে সঠিকভাবে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা করতে হবে।
জমাট বাঁধা রক্ত তরল করতে যে সব ওষুধ সেবন করতে হয়। তার মধ্যে অ্যান্টিপ্লেস (Alteplasc) ও অ্যাসপিরিন উল্লেখযোগ্য।
আর মাত্রাতিরিক্ত রক্তচাপ কমাতে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:
থায়াজাইড ডাই-ইউরেটিক (Thiazide Diuretics)। এই ওষুধ প্রস্রাবের মাত্রা বাড়িয়ে শরীর থেকে পানির পরিমাণ কমিয়ে দেয় এবং রক্তের পরিমাণ কমে গিয়ে রক্তচাপ কমিয়ে দেয়া।
রক্তে যদি কোলেস্টেরল বা LDL এর মাত্রা বেশী থাকে তাহলে Statin গ্রুপের ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।
আরো পড়ুনঃ
- কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু বাচ্চার ওজন এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটছে কি না? জেনে নিন
- কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন || পর্ব-১
- কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন || পর্ব-২
- মানব মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান নিউরন সম্পর্কে জেনে নিন
- টনসিলাইটিস | টনসিলের প্রদাহজনিত গলা ব্যথা রোগ সম্পর্কে জেনে নিন



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url