কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন || পর্ব-২
পেজ সূচিপত্রঃ
- টাইফয়েড জ্বর পরীক্ষা/ভিডাল টেস্ট (Widal Test)
- সিবিসি (Complete Blood Count)
- ব্লাড কালচার (Blood Culture)
- অন্যান্য পরীক্ষাসমূহ
- প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা (Urine RME)
- মলের রুটিন পরীক্ষা (Stool RME)
- ই.সি.জি. বা ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG)
- এনজিওগ্রাম (Angiogram)
- আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (Ultrasonography)
- এক্সরে (X-ray)
- ডায়াবেটিস টেস্ট (Diabetes Test)
- মুখে খাওয়া গ্লুকোজের সহনশীলতা পরীক্ষা (OGTT)
- অভুক্ত অবস্থায় রক্তের গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা (FBS)
- ভুক্ত অবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা (RBS)
- গর্ভাবস্থায় রক্তের কিছু পরীক্ষা
- রক্তের গ্রুপ নির্ণয়
- রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা
- হেপাটাইটিস ভাইরাসের জন্য পরীক্ষা
- যৌনবাহিত রোগ সিফিলিসের জন্য রক্ত পরীক্ষা
- রক্তের শর্করা পরীক্ষা
টাইফয়েড জ্বর পরীক্ষা/ভিডাল টেস্ট (Widal Test)
ভিডাল পরীক্ষা (Widal Test) রক্তরস বা রক্তের একটি পরীক্ষা। রোগীর তীব্র জ্বর যখন ৪/৫ দিনের বেশী স্থায়ী হয় তখন রোগের কারণ নির্ণয়ে এই পরীক্ষাটি করা হয়। এই পরীক্ষাটির ফলাফল থেকে জানা যায় রোগীর টাইফয়েড জ্বর হয়েছে কিনা। টাইফয়েড জ্বর হবার ৫-৭ দিন পরে এই টেস্টটি সঠিক ফলাফল দিতে খুবই কার্যকর।
টাইফয়েডের জীবাণু শরীরে ঢুকলে শরীরের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে তা ভিডাল টেস্ট করে তার মাত্রা দেখা হয়। তবে ভিডাল টেষ্ট টাইফয়েড নিশ্চিত করার কোন পরীক্ষা নয় এবং কি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে রোগ ভাল হবে তা সম্পর্কেও এটি কোন ধারণা দিতে পারেনা। এই ধারণা পেতে হলে রক্তের কালচার (Blood culture) পরীক্ষাটি করে দেখতে হয়। একটু পরে ব্লাড কালচার (Blood Culture) সম্পর্কেও জানতে পারবেন।
সিবিসি (Complete Blood Count)
কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট টেস্টের মাধ্যমে রক্তের বিভিন্ন কণিকার হ্রাস-বৃদ্ধি কতটা হয়েছে তা দেখা হয়। সিবিসি টেস্ট অন্তত বছরে একবার করা উচিত। এই পরীক্ষা করার ফলে হিমোগ্লোবিন, সাদা কণিকা (সেল) এবং প্লাটিলেট গণনা করা হয়। শরীরের রক্তের কী অবস্থা তা সিবিসি চেকআপের মাধ্যমে জানা যায়।
ব্লাড কালচার (Blood Culture)
ব্লাড কালচার পরীক্ষা করতে সাধারণত তিন দিন সময় লাগে। কী ধরণের জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছে এবং সেই জীবাণুর বিপক্ষে কোন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকরী তা দেখা হয়।
শরীরে যে জীবাণু-ই আক্রমণ করুক না কেন, যেখানেই আক্রমণ করুক না কেন প্রায় সব সময়-ই তা রক্তে চলে আসে।
জীবাণুটি বংশ বৃদ্ধি করে বেড়ে উঠলে এরপর তাকে বিভিন্ন বর্ণে রঙ্গিন করে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে দেখে শনাক্ত করা হয়। এরপর কোন কোন অ্যান্টিবায়োটিক এই জীবাণুর উপর কাজ করবে তা নির্ণয়ের জন্য জীবাণুগুলোকে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয়। একে সেনসিটিভিটি টেস্ট (Sensitivity test) বলা হয়।
ব্লাড কালচার পরীক্ষার ফলাফল পেতে এক এক জীবাণুর জন্য এক এক সময় লাগে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তিন দিনের মধ্যে এর ফলাফল পাওয়া যায়। তবে টিবির জীবাণু কালচার করে পেতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে । ব্লাড কালচার করে দায়ী ব্যাকটেরিয়াটি সম্পর্কে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এর অল্পকিছু ব্যতিক্রম আছে।
অন্যান্য পরীক্ষাসমূহ
প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা (Urine RME)
মলের রুটিন পরীক্ষা (Stool RME)
ডায়রিয়াতে Stool RME পরীক্ষায় Pus Cell, RBC এর তথ্য খুবই গুরত্বপূর্ণ সেক্ষেত্রেই শুধু Antibiotic এর প্রয়োজন হতে পারে। তবে Mucus (++) বা বেশী দেখলেই শুধু Metronidazole দেয়া যেতে পারে। কৃমির ডিম (Ova of worms/Helminths) পাওয়া গেলে কৃমিনাশক ওষুধ দেয়া প্রয়োজন হয়।
ই.সি.জি. বা ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG)
ই.সি.জি. হার্টের মাংসপেশির অবস্থা জানার, ইহার স্পন্দন গতি নির্ণয় করার জন্য করা হয়। হার্ট অ্যাটাক এবং হার্টের স্পন্দনের গতি ও প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা।
ই.সি.জি করার মাধ্যমে হার্টের স্পন্দন-এর হার, তা নিয়মিত কিনা, বিদ্যুৎ পরিবহনে কোন বাধা আছে কিনা, হার্ট-এ ব্লক আছে কিনা, ইশকেমিয়া বা ইনফার্কশন আছে কিনা, হার্ট-এর মাংশপেশি মোটা হয়ে গেছে কিনা ইত্যাদি তথ্য খুব সহজে নির্ণয় করে বুঝা যায়।
এনজিওগ্রাম (Angiogram)
এনজিওগ্রাম এমন একটি পরীক্ষা যার মাধ্যমে শরীরের ধমনি ও শিরাগুলোকে পরোক্ষভাবে দেখা যায়। পরোক্ষভাবে বলা হচ্ছে এই কারণে যে, ধমনি ও শিরা প্রত্যক্ষভাবে দেখারও সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত এনজিওগ্রাম মানেই হার্টের রোগ নির্ণয়ের একটি পরীক্ষা। হার্টে ইশকেমিক হার্ট ডিজিজ হলে এনজিওগ্রাম পরীক্ষাটি করানো লাগতে পারে তবে তাকে করোনারি এনজিওগ্রাম (CAG: Coronary Angiogram) বলে। করোনারি এনজিওগ্রাম করে হৃৎপিন্ডের ধমনি সরু হয়ে গেছে কিনা বা এতে কোন Block আছে কিনা তা দেখা হয়।
হার্ট ছাড়াও অন্য অঙ্গে এনজিওগ্রাম করা হয়ে থাকে যেমন: পায়ে করলে তাকে বলে পিএজি (PAG-Peripheral Angiogram), মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে সেরিব্রাল এনজিওগ্রাম (Cerebral Angiogram), অন্ত্রে করলে মেসেন্ট্রিক এনজিওগ্রাম (Mesentric Angiogram), কিডনিতে করলে রেনাল এনজিওগ্রাম (Renal Angiogram), গলার ধমনিতে করলে ক্যারোটিভ এনজিওগ্রাম (Carotid Angiogram) ইত্যাদি।
আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (Ultrasonography)
শরীরের ভেতরের অঙ্গ যেমন: লিভার, পিত্তথলি, কিডনি, জরায়ু, ডিম্বাশয় ইত্যাদির যেকোনা আকৃতিগত অসুবিধা হলেই তা নির্ণয় করা যায়। গর্ভাবস্থায় পেটের বাচ্চার অবস্থা ও অবস্থান নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ইহা ছাড়াও শরীরের ভিতরে যে কোন অংশে পাথর, টিউমার, সন্দেহ হলেও এ পরীক্ষার জন্য পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
এক্সরে (X-ray)
X-ray এর সাহায্যে অনেক কিছুই নির্ণয় করা যায়। প্রধানত হাড় বা Bone ভাঙ্গা, প্রদাহ, জয়েন্টের অবস্থা, ফুসফুস (নিউমোনিয়া / টিবি রোগ) ও হার্টের রোগ, পিত্তথলি, পিত্তনালি, কিডনি বা প্রস্রাবের থলিতে পাথর থাকলে তা নির্ণয় করা যায়।
ডায়াবেটিস টেস্ট (Diabetes Test)
কোন ব্যক্তির ডায়াবেটিস আছে কিনা তা নির্ণয় করার জন্য সাধারণত ৩ টি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
(ক) ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)।
(খ) ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS)।
(গ) রেন্ডম ব্লাড সুগার (RBS) |
মুখে খাওয়া গ্লুকোজের সহনশীলতা পরীক্ষা (OGTT):
মুখে (৭৫ গ্রাম) গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পর রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম/ডি.এল অর্থাৎ ১১.১ মিলি মোল/ডি.এল বা তা অপেক্ষা বেশী হলে তাকে ডায়াবেটিস ধরা হয়। এই পরীক্ষা ‘ধরন-২ ডায়াবেটিস’ শনাক্ত করার জন্য বেশী ব্যবহৃত হয়। এই মাত্রা ১৪০ মিলিগ্রাম/ডি.এল থেকে ১৯৯ মিলিগ্রাম/ডি. এল অর্থাৎ ৭.৮ থেকে ১১ মিলি মোল/ডি.এল এর মধ্যে হলে এই অবস্থাকে Impaired Glucose Tolerance (IGT) হিসেবে ধরা হয় এবং যা ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার ইঙ্গিত বহন করে।
অভুক্ত অবস্থায় রক্তের গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা (FBS):
অভুক্ত অবস্থায় যদি পর পর দু’বার ১২৬ মিলিগ্রাম/ডি.এল অর্থাৎ ৭.০ মিলি.মোল/ ডি.এল বা তা অপেক্ষা বেশী হয় তবে ডায়াবেটিস হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। এই মাত্রা ১০০ থেকে ১২৬ মিলিগ্রাম/ডি.এল বা ৫.৬ থেকে ৬.৯ মিলি মোল/ডি.এল এর মধ্যে হলে তাকে ডায়াবেটিস হওয়ার পূর্ব-অবস্থা হিসেবে ধরে নেয়া হয়। এই মাত্রাগুলোকে ‘ধরন-২ ডায়বেটিসে’ আক্রান্ত হওয়ার বিপদ সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভুক্ত অবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা (RBS):
ভুক্ত অবস্থায় ২০০ মিলিগ্রাম/ডি.এল বা ১১.১ মিলি মোল/ডি.এল অপেক্ষা বেশী হলে এবং সেই সঙ্গে ডায়াবেটিসের উপসর্গ যেমন: অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অবসাদ ইত্যাদি থাকলে ডায়াবেটিস হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রোগ শনাক্তকরণের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ‘মুখে খাওয়া গ্লুকোজের সহনশীলতা পরীক্ষা’ অর্থাৎ (GIT) অবশ্যই করে নিতে হবে।
উপরের পরীক্ষাগুলো ছাড়াও প্রতি ৩-৬ মাসের মধ্যে অন্তত একবার হিমোগ্লোবিনের Alc (HbA1c) পরীক্ষা করে দেখা উচিত। এই HbA1c নিরূপণের মাধ্যমে পূর্বের ২-৩ মাস সময়ের মধ্যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কেমন ছিল তা অনুমান করা যায়। ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ফলাফল বোঝার জন্য যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারো Alc এর মাত্রা ৫.৭ থেকে ৬.৪ এর মধ্যে হলে তাকে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ হবার অন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। পরীক্ষাটি যে কোন সময়ে করা যায়। কোন পূর্ব প্রস্তুতি প্রয়োজন হয় না।
HbA1C এর মাত্রা-
৫.৭% এর কম হলে ডায়াবেটিস নেই বলে ধরে নেয়া হয়। ৫.৭% থেকে ৬.৪% এর মধ্যে হলে প্রি-ডায়াবেটিস অবস্থা বলা হয়। ৬.৫% বা এর বেশি হলে ডায়াবেটিস আছে বলে ধরে নেয়া হয়।
গর্ভাবস্থায় রক্তের কিছু পরীক্ষা
• রক্তের গ্রুপ নির্ণয়
এ কথা মোটামুটি সবাই জানে যে, রক্তের গ্রুপ না মিললে জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষা করার জন্য রক্ত সঞ্চালন করা যায় না। এজন্য একজন গর্ভবতীর রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একজন সচেতন গর্ভবতীর উচিৎ তাঁর রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা এবং গ্রুপ মিলিয়ে কয়েকজন পরিচিত সম্ভাব্য রক্তদানকারী ঠিক করে রাখা। প্রয়োজনের সময় যেন অবিলম্বে ভাল মানের রক্ত পাওয়া যায়। সম্ভাব্য রক্তদানকারীকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবান ও সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত হতে হবে। বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে।
• রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা
বাড়তি চাহিদার কারণে গর্ভকালে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হতে পারে। তাই মাঝে মাঝে পরীক্ষা করে দেখতে হবে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক আছে কিনা ।
• হেপাটাইটিস ভাইরাসের জন্য পরীক্ষা
মারাত্মক হেপাটাইটিস-বি গর্ভকাল ও প্রসবকে জটিল করতে পারে। নবজাতককে সংক্রমিত করতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় রক্ত পরীক্ষা করে হেপাটাইটিস সম্পর্কে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
• যৌনবাহিত রোগ সিফিলিসের জন্য রক্ত পরীক্ষা
সিফিলিস সহজে চিকিৎসাযোগ্য। কিন্তু মা ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রোগ। তাই গর্ভকালে সিফিলিস আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা খুবই জরুরি।
• রক্তের শর্করা পরীক্ষা
গর্ভকালে বহুমূত্র রোগ (Diabetes) একটি সাধারণ জটিলতা। তাই নিয়মিত বহুমূত্র রোগ নির্ণয়ের লক্ষ্যে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে।
- কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু বাচ্চার ওজন এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটছে কি না? জেনে নিন
- কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন || পর্ব-১
- স্ট্রোক হয়েছে কিনা তা বোঝার সহজ উপায় || জেনে নিন
- মানব মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান নিউরন সম্পর্কে জেনে নিন
- টনসিলাইটিস | টনসিলের প্রদাহজনিত গলা ব্যথা রোগ সম্পর্কে জেনে নিন



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url