কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন | পর্ব-১
পরীক্ষা নিরীক্ষা একজন রোগীর পরিপূর্ণ চিকিৎসা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কেবল অসুস্থ ব্যক্তিই নন সুস্থ অবস্থাতেও একজন মানুষের শারীরিক অবস্থা জানতে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসক রোগের ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা করে সম্ভাব্য অসুখ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সাধারণত রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে ইসিজি, সিটি স্ক্যান অথবা কোলনোস্কোপি দিয়ে থাকেন। বর্তমানে রোগ নির্ণয় সঠিক প্যাথলজি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফলাফলের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। আগে রোগীর নাড়ি দেখে, হাঁটা চলা দেখে রোগ নির্ণয় সম্ভব হলেও এখন এটা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে যে কোন রোগ নির্ণয়ের পূর্বশর্ত হল রোগীর সঠিক রোগের ইতিহাস, ফিজিক্যাল পরীক্ষা এবং সবশেষে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা। এ তিনটির সমন্বয় ছাড়া বর্তমানে কোন রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং পরবর্তী ফলোআপ সম্ভব নয়।
পেজ সূচিপত্রঃ
- সরাসরি রোগ নির্ণয়ে
- মানব দেহের অভ্যন্তরীণ সাম্যাবস্থা জানতে
- চিকিৎসার ফলাফল এবং অসুখের ধারাবাহিকতা নির্ণয়ে
- অসুখের ঝুঁকি/ সম্ভাব্যতা নির্ণয়
- অপারেশন/ডায়ালাইসিস / কেমোথেরাপি পূর্ববর্তী রুটিন চেকআপ
- মানবদেহ সম্পর্কিত নির্দিষ্ট তথ্য জানতে
- আইনগত কারণে
- রক্ত পরীক্ষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ফলাফলে ‘পজিটিভ’ হতে পারে নেতিবাচক খবর
- ‘ভুল পরীক্ষা’ অস্বাভাবিক বিষয় নয়
- ‘কোনো পরীক্ষায় বিরূপ ফল’ মানেই রোগ আছে তা নয়
- ল্যাবরেটরি ভেদে ‘ফলাফল ভিন্ন’ হতে পারে
- সাধারণ ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাসমূহ
এই সকল পরীক্ষা করার কারণ
• সরাসরি রোগ নির্ণয়ে
অধিকাংশ পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষা থেকেই সাধারণত সরাসরি অসুখ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। যেমন: রক্ত পরীক্ষা থেকে রক্তস্বল্পতা, ডায়াবেটিস। ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম থেকে হার্ট অ্যাটাক (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন)। এক্সরে থেকে হাড় ভাঙ্গা। প্রস্রাব পরীক্ষা থেকে প্রস্রাবের সংক্রমণ। বায়োপসি থেকে ক্যান্সার ইত্যাদি।
• মানব দেহের অভ্যন্তরীণ সাম্যাবস্থা জানতে
কিছু পরীক্ষা থেকে মানব দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এসব পরীক্ষা সরাসরি রোগ নির্ণয় না করলেও রোগ নির্ণয়ে পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। যেমন: রক্ত পরীক্ষা থেকে বিভিন্ন হরমোন, লবণ এবং অন্যান্য উপাদান, কোলেস্টেরল, লিপিড, রক্ত কণিকা (যেমন: শ্বেত অঙ্গের কণিকা, অনুচক্রিকা) বিভিন্ন এনজাইম। বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমে স্বাভাবিকতা সম্পর্কে ধারণা যেমন লিভার ফাংশন টেস্টের মাধ্যমে লিভারের অবস্থা, থায়রয়েড ফাংশন টেস্ট, সিমেন অ্যানালাইসিস ইত্যাদি।
• চিকিৎসার ফলাফল এবং অসুখের ধারাবাহিকতা নির্ণয়ে
কোন কোন অসুখে চিকিৎসা পরবর্তী সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পরীক্ষা করা হয়, যেমন: যক্ষ্মা রোগের ক্ষেত্রে কফ এবং এক্সরে পরীক্ষা। দীর্ঘ মেয়াদী অসুখের ক্ষেত্রে অসুখের মাত্রা, চিকিৎসায় প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য কিছু পরীক্ষা করা হয়; যেমন: হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ধারাবাহিকভাবে পিসিআরের মাধ্যমে অসুখের পরিস্থিতি দেখা হয়।
• অসুখের ঝুঁকি/ সম্ভাব্যতা নির্ণয়
অসুখের লক্ষণ প্রকাশের পূর্বে কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে অসুখ প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা যায়। এ সকল পরীক্ষাকে স্ক্রিনিং টেস্ট বলে। যেমন: জরায়ু মুখের ক্যান্সারের জন্য ভায়া টেস্ট, প্যাপ স্মেয়ার করা, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকিযুক্ত রোগীর কোলনস্কোপি করা। পরীক্ষার মাধ্যমে মানব শিশু জন্যের পূর্বে ও পরে বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি, প্রতিবন্ধিতা যেমন: ডাউনসিন্ড্রোম, থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করা হয়।
আরো পড়ুনঃ কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু বাচ্চার ওজন এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটছে কি না? জেনে নিন
• অপারেশন/ডায়ালাইসিস / কেমোথেরাপি পূর্ববর্তী রুটিন চেকআপ
অপারেশনকালীন অ্যানেস্থেশিয়া সম্পর্কিত ‘জটিলতা’ এড়াতে এবং অপারেশনের পূর্বে ডায়াগনোসিস নিশ্চিত হতে বয়স ভেদে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা করা হয়। যেমন: রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্সরে, প্রস্রাব পরীক্ষা, ইসিজি ইত্যাদি।
• মানবদেহ সম্পর্কিত নির্দিষ্ট তথ্য জানতে
চিকিৎসা সম্পর্কিত ছাড়াও মানব দেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, অবস্থা জানতে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়, যেমন: রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, প্রেগনেন্সি টেস্ট, রক্তদানের পূর্বে রক্তে ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস-বি, এইচ আইভি সহ নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা করা হয়।
• আইনগত কারণে
বয়স নির্ধারণে এক্সরে, অপরাধী শনাক্তকরণ বা পিতৃত্ব নির্ণয়ে ডিএনএ টেস্ট, চাকরির জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া রোগের কারণ ও জটিলতা যেমন: স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ফেইলর, অসুখের বিস্তৃতি যেমন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া, দুর্ঘটনা বা দীর্ঘস্থায়ী অসুখের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের পরিস্থিতি নিরুপণে চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে থাকেন।
রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা একটা ভালো হাতিয়ার। শরীরের রক্ত হলো নানা ধরনের কোষের সমষ্টি, আর অন্যান্য যৌগিক বস্তু। যেমন বিভিন্ন ধরনের লবণ, প্রোটিন ইত্যাদিও থাকে। এগুলোর প্রতিটিরই প্রয়োজনীয়তা আছে এবং এদের স্বল্পতা বা আধিক্য সমস্যা নির্দেশ করে। রক্তের তরল অংশকে বলা হয় প্লাজমা। যখন শরীরের বাইরে রক্ত জমে যায়, তখন রক্তের কোষগুলো এবং কিছু কিছু প্রোটিন শক্ত হয়ে যায়।
• রক্ত পরীক্ষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সাধারণ মানুষ রক্ত পরীক্ষার গুটি কয়েক অংশ সম্পর্কে জেনে থাকেন চিকিৎসকের কাছ থেকে। ব্লাড কাউন্ট, সিবিসি কিংবা বেসিক মেটাবলিক প্যানেল শব্দগুলো বেশ পরিচিত।জীববিজ্ঞান নরমাল বা স্বাভাবিক ফলাফল নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে একই অর্থ প্রকাশ করে বলে মনে করে না। এটা অবশ্য টেস্টের ফলাফলেই চোখ দিলে পেয়ে যাবেন।
সব বয়সের জন্যেও ‘নরমাল’ ফলাফল এক নয়। বেশ কয়েকটি পরীক্ষা রয়েছে যেখানে ‘নরমাল’ সীমা বয়সের সঙ্গে বদলে যায়। হিমোগ্লোবিনের ক্ষেত্রে তাই নয়। রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রাও বয়সের সঙ্গে বদলে যায়। আবার এলডিএল কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা বয়সের সঙ্গে বদলায় না। সব বয়সীদের জন্যেই এর মাত্রা ১০০ মিগ্রা/ডিএল এর মধ্যে থাকা উচিত।
• ফলাফলে ‘পজিটিভ’ হতে পারে নেতিবাচক খবর
এইচআইভি, হেপাটাইটিস 'সি' কিংবা শিকল সেল অ্যানিমিয়া টেস্টের ক্ষেত্রে ফলাফলে ‘পজিটিভ’ আসাটা কিন্তু খারাপ খবর দেয়। এর অর্থ আপনি ওই রোগে আক্রান্ত। কাজেই এসব রোগের পরীক্ষায় ‘নেগেটিভ’ ফলাফল পেলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।
• ‘ভুল পরীক্ষা’ অস্বাভাবিক বিষয় নয়
• ‘কোনো পরীক্ষায় বিরূপ ফল’ মানেই রোগ আছে তা নয়
কোনো পরীক্ষায় যদি বিরূপ ফল আসে, তবে তা সব সময় রোগের উপস্থিতি নির্দেশ করে না। অনেক কারণে এটা হতে পারে। বিশেষ সমস্যায় ওষুধপত্র খেতে থাকলে, অ্যালকোহল পান করলে, পরীক্ষার আগে খাওয়া যাবে না নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা খেলে উল্টোপাল্টা ফলাফল আসতেই পারে। সেক্ষেত্রে তার রোগ নির্দেশ করে না। এ বিষয়ে পরীক্ষার আগে ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করে নিতে হয়।
• ল্যাবরেটরি ভেদে ‘ফলাফল ভিন্ন’ হতে পারে
একই পরীক্ষা ভিন্ন ভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা হলে একেক ধরনের ফলাফল আসতেই পারে। কারণ, যে নমুনা সংগ্রহ করা হয় তা পরীক্ষার ক্ষেত্রে একেক পরীক্ষাগার একেক সীমারেখা নির্ধারণ করে নিতে পারে। তবুও সন্দেহ থাকলে ডায়াগনস্টিক সেন্টার বদলানো যেতে পারে।
• সাধারণ ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাসমূহ
টিসি (Total Count/TC)
প্রতি সিসি রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার সংখ্যা ৪,০০০-৮,০০০। যে কোন জ্বরের রোগীর ক্ষেত্রে ইহা খুবই অর্থবহ। সাধারনত: ইহা ভাইরাসজনিত ইনফেকশনে কমে যায়; যেমন: ফ্লু (ইনফ্লুয়েঞ্জা), ঠান্ডা (Cold), ডেঙ্গু, ভাইরাল জন্ডিস। আবার ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশনে বেড়ে যায়। ব্যতিক্রম: ব্যাকটেরিয়াজনিত টায়ফয়েড জ্বরে এই সংখ্যা প্রতি সিসি তে ৪,০০০-এর কম হতে পারে। এ সংখ্যা ২৫,০০০ / প্রতি সিসি এর বেশী হলে যেমন বেশী গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ২,৫০০/ প্রতি সিসি এর কম হলেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
আরো পড়ুনঃ কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন || পর্ব- ২
ডিসি (Differential Count/DC)
সাধারনত: ইহা ভাইরাস জনিত ইনফেকশানে Lymp ৬০% বা এর বেশী হতে পারে আবার ব্যাকটেরিয়া জনিত ইনফেকশনে Polymorph Eosinophil 10% এর বেশী হলে অ্যালার্জির ধারণা করা হয়।
বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ভিন্ন। সাধারণত জন্মের সময় নবজাতক শিশুর দেহে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ থাকে ২০০ গ্রাম/লিটার। পরবর্তীকালে তিন মাস বয়স থেকে তা কমতে থাকে এবং প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। পরে প্রাপ্ত বয়সের সময় হিমোগ্লোবিন আবার বাড়তে শুরু করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ১৩০-১৮০ গ্রাম/লিটার আর মহিলাদের ক্ষেত্রে ১১৫-১৬৫ গ্রাম/লিটার। এক্ষেত্রে পুরুষ কিংবা মহিলা যে-ই হোক যদি কারো হিমোগ্লোবিন ৭০ কিংবা ৮০ গ্রাম/লিটার হয়ে থাকে, তবে সেক্ষেত্রে মারাত্মক অ্যানিমিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
স্বাভাবিক অপেক্ষা কম হলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া আছে বুঝতে হবে। সাধারণত পুষ্টিজনিত কারণে হতে পারে। উচ্চতর পরামর্শ নেয়ার জন্য রেফার করা ছাড়াও কৃমিনাশক এবং ফলিক এসিড (রক্ত তৈরীর উপাদান) খেতে বলা যেতে পারে।
ইএসআর (Erythrocyte Sedimentation Rate/ESR)
লোহিত কণিকার তলানী পড়ার গতি-হার স্বাভাবিক মাত্রার ঊর্ধ্বসংখ্যা (পুরুষ) 10 mm / 1st hr) ও 20 mm/1st hr (মহিলা)। সাধারনতঃ 50 mm/1st hr এবং এর বেশী খুবই তাৎপর্য বহন করে। ইহা প্রদাহ (যেমনঃ রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, রিউমেটিক ফিভার ইত্যাদি), দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ (যেমন: যক্ষা রোগ ইত্যাদি) ও অন্য যে কেনো ক্ষয়কারী রোগে বেড়ে যেতে পারে (যেমন: ক্যান্সার ইত্যাদি)।
- কিভাবে বুঝবেন আপনার শিশু বাচ্চার ওজন এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটছে কি না? জেনে নিন
- স্ট্রোক হয়েছে কিনা তা বোঝার সহজ উপায় || জেনে নিন
- কিভাবে মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্ট সহজে বুঝবেন || পর্ব-২
- মানব মস্তিষ্কের মূল গঠন উপাদান নিউরন সম্পর্কে জেনে নিন
- টনসিলাইটিস | টনসিলের প্রদাহজনিত গলা ব্যথা রোগ সম্পর্কে জেনে নিন



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url