টনসিলাইটিস | টনসিলের প্রদাহজনিত গলা ব্যথা রোগ সম্পর্কে জেনে নিন

পেজ সূচিপত্রঃ

টনসিল রোগের বর্ণনা (Disease Description) 

টনসিলাইটিস | টনসিলের প্রদাহজনিত গলা ব্যথা রোগ সম্পর্কে জেনে নিন
জিহ্বার শেষপ্রান্তে, আলজিহ্বার নিচে বাম ও ডানপাশে বাদামের মত ১.৫ সেন্টিমিটারের মত আকারের লাল বর্ণের মাংসপিন্ডকে টনসিল (Tonsil) বলা হয়। টনসিল দেখতে মাংসপিন্ডের মতো মনে হলেও এটি লসিকা কলা বা লিম্ফয়েড টিস্যু দিয়ে তৈরি। মুখগহ্বরের দু'পাশে দুটি টনসিলের অবস্থান। মুখ, গলা, নাক কিংবা সাইনাস হয়ে রোগ জীবাণু অন্ত্রে বা পেটে ঢুকতে বাধা দেয় এই টনসিল। অর্থাৎ টনসিল শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।

টনসিলাইটিস (Tonsillitis) হচ্ছে টনসিলসমূহ যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের সংক্রমণ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে প্রদাহের বা ইনফেকশনের সৃষ্টি করে ভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। জন্ম থেকেই গলার মধ্যে এই টনসিল থাকে।

টনসিল রোগের কারণ (Causes)

• স্ট্রেপটোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।

• ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেলে। 

• আইসক্রিম খেলে।

• খুব বেশি ঠান্ডা লাগলে।

টনসিল রোগের প্রকারভেদ (Classification) 

টনসিলাইটিস সাধারণত দুই ধরনের হয়:

• তীব্র বা অ্যাকিউট (Acute)

• দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক (Chronic)

টনসিল রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ (Symptom & Sign)

• গলার স্বর পরিবর্তিত হয়, নিঃশ্বাসে দূর্গন্ধ থাকে। সঙ্গে শিশুর খাবার গ্রহণে অনীহা কিংবা নাক দিয়ে পানি ঝরা ইত্যাদি থাকতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে গলার বাইরে দিকে গ্রন্থি ফুলে যেতেও দেখা যায়।

• ভাইরাসজনিত টনসিলাইটিসে টনসিলের প্রদাহ ধীরে ধীরে বাড়ে, ফলে উপসর্গগুলোও ধীরে ধীরে আবির্ভূত হয়। অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়াজনিত টনসিলাইটিস হঠাৎ করেই তীব্রভাবে আক্রমণ করে। ফলে উপসর্গ সমূহ এবং গলাব্যথা, জ্বালা পোড়া ইত্যাদি হঠাৎ করেই দেখা দেয়।

• শিশুদের ক্ষেত্রে বমি, পেটে ব্যথা; বড়দের ক্ষেত্রে মাথাব্যথাও থাকতে পারে। ৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ডাইরিয়া সহ খাওয়া দাওয়ায় অরুচির লক্ষণ পাওয়া যায় ও সেই সাথে সকলেরই কম বেশি কাশিও হতে পারে।

অ্যাকিউট টনসিলাইটিসের লক্ষণ:

  •  ঠাণ্ডা ।
  •  অত্যধিক জ্বর বা জ্বরের সাথে কাঁপুনি।
  •  গলাব্যথা
  •  খুসখুসে কাশি।
  •  নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা।
  • ক্রনিক টনসিলাইটিসের লক্ষণ:
  •  জিনিসের গন্ধ পাওয়া যায় না।
  •  ঘুমাতে খুব অসুবিধা হয়।
  •  শিশু ঘুমাতে ভয় পায়।
  •  নাক ডাকার সমস্যা হতে পারে।
  •  থুতনি এগিয়ে আসে।
  •  মাথাব্যথা।
  •  ঘায়ের কারণে গলায় ব্যথা।
  •  কানে ব্যথা।
  •  ক্লান্তিময়তা।
  •  মুখে অনবরত লালা জমতে থাকা।
  •  মুখ দিয়ে লালা বের হওয়া ও কন্ঠস্বর ভারী হওয়া।
  •  মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে পারে।

টনসিল রোগের সতর্কতা (Precaution)

• সাধারণভাবে টনসিলাইটিসে আক্রান্ত হবার কয়েক দিনের মধ্যে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। তারপরও কিছু সতর্কতা বিশেষতঃ খাদ্যাভাসের কিছুটা পরিবর্তন করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এই অবস্থায় শরীরে পানিশূন্যতা (Dehydration) দেখা দেয় প্রকটভাবে। সেজন্য প্রচুর পরিমাণে পানি সহ যেকোনো পানীয় খাওয়া যেতে পারে। গরম যেকোনো পানীয় (অত্যাধিক গরম নয়) যেমন : হালকা গরম চা, চকোলেট পানীয়, কুসুম গরম পানি সাথে মধু, এমন কি ঠাণ্ডা পানীয় যথা মিল্কসেক (Milk shake) খাওয়া যায়। কোমল পানীয়: আদা পানি (Ginger ale) এ সময় উপকারে আসে।

• তবে কোন অ্যাসিড জাতীয় পানি না খাওয়া ভাল: কোক, স্প্রাইট খাওয়া যাবে না। অ্যাসিড জাতীয় পানি গলায় ইনফেকশনে উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি নরম খাবার যথা জাউ ভাত, যে কোন স্যুপ এ সময় অনেক উপকার দেয়।

• খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি এক কাপ কুসুম গরম পানির সাথে ১/৪ চা চামচ লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। দিনে অন্ততপক্ষে ৩/৪ বার করা উচিত। সাথে বিশ্রাম নিতে হবে।

টনসিল রোগ নির্ণয়/ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (Investigation)

টাং ডিপ্রেসর (মুখ খোলার এক ধরনের ফরসেপ বিশেষ) দিয়ে জিহ্বাকে চেপে ধরে ভেতরে প্রদাহ আছে কিনা দেখে বোঝা সহজ যে টনসিলাইটিস হয়েছে। প্রদাহের কারণে টনসিল বড় ও লালাভ হয়ে থাকে।

টনসিলাইটিস নির্ণয়ে এই পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। তারপরও নিম্নের দুটি পরীক্ষার দ্বারা নিশ্চিত হওয়া যায় কোন ধরনের টনসিলাইটিস হয়েছে। ভাইরাসজনিত হলে ভাইরাস সেনসিটিভিটি কালচার করাতে পারলে বুঝা যায় কোন ধরনের ভাইরাস আক্রমণের জন্য বেশি দায়ী।

• Rapid Strep Test (এ পরীক্ষার দ্বারা গলার ভিতরের ইনফেকশনের উপরের ঝিল্লির মিউকাস পরীক্ষা করে মাত্র ৭ মিনিটে নিশ্চিত হওয়া যায় ইহা স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা আক্রান্ত কিনা)।

• Strip Culture (পরীক্ষাগারে স্ট্রেপট্রোকক্কাস কালচার করাকে বলা হয় Strep Culture। এই সব পরীক্ষার আগে কোন জাতীয় অ্যান্টিসেপটিক মাউথ ওয়াস ব্যাবহার করা নিষেধ)।

টনসিল রোগের চিকিৎসা (Treatment)

টনসিলাইটিসের চিকিৎসা দুই ভাবে করা যায়-

১. ওষুধ সেবন। 

২. অপারেশন।

টনসিলের চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের উপর। যদি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে তাহলে ওষুধ সঠিক নিয়মে সেবন করলে মাত্র ৭ দিনে ১০০% নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় টনসিলের প্রদাহ ভাল হয়ে যাবে । ডাক্তারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ৭ থেকে ১০ দিন খেতে হবে।

সেই সাথে মাউথ ওয়াশ দিয়ে (ওরোক্লিন) কুলি করলে বেশ ভাল হবে বা নরমাল স্যালাইন (ওয়াটার গার্গেল) গরম পানি দিয়ে গড়গড়া কুলি করা উচিৎ। জ্বর থাকলে অ্যানালজেসিক (প্যারাসিটামল) ওষুধ, সর্দি কাশি থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন সেবন করতে হবে।

টনসিলের অপারেশন:

ক্রনিক টনসিলাইটিসের কারণ ছাড়াও আরো অনেক কারণে টনিসল অপারেশন করা দরকার; যেমন অনেক ছোট বাচ্চার টনসিলগুলো বড় হয়ে গেছে। টনসিল বড় হয়ে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হয়। তখন তার ব্রেইনে অক্সিজেন কমে যায়। সে পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে যায়। সেসব ক্ষেত্রে টনসিল অপারেশন করে ফেলে দেয়া উচিত। টনসিল অপারেশন না করলে রাতে বাচ্চা মুখ হা করে ঘুমায়, নাক ডাকে এবং অনেক অসুবিধা হয়।

টনসিল কখন অপারেশন করাবেন:

• বছরে পাঁচ-সাত বার রোগের লক্ষণ দেখা দিলে। 

• টনসিলে একবার ফোঁড়া বা পুঁজ হলে। 

টনসিল অপারেশনের পদ্ধতি

ইলেকট্রকটারি, লেজার পদ্ধতিতে টনসিল অপারেশনের সুবিধা হলো এটি রক্তপাতহীন, নিরাপদ, আধুনিক এবং কম সময় লাগে। ইলেকট্রকটারি, লেজার পদ্ধতিতে টনসিল অপারেশনে কোনও সেলাই লাগে না। অপারেশনের পরই রোগী মুখে খেতে পারবে।

পোস্ট সম্পর্কিত আপনাদের সকল জিজ্ঞাসাঃ

গলায় ব্যথা কেন হয় , টনসিল এর ব্যাথা কত দিন থাকে? , সর্দি ও গলা ব্যথা কেন হয় , টনসিলের ব্যথায় করণীয় , গলা ব্যথা হলে করণীয় , গলা ব্যথা হলে কি খাওয়া উচিত , ঢোক গিলতে গলায় ব্যাথা , টনসিলের এন্টিবায়োটিক ঔষধ , দীর্ঘদিন গলা ব্যাথা , টনসিলের ব্যথা কোথায় হয় , ঢোক গিলতে গলা ব্যথার কারণ , টনসিলাইটিস হলে কি রোগ হয় , টনসিল ফুলে গেলে কেমন হয় , টনসিলের ঘরোয়া চিকিৎসা , টনসিল পেকে গেলে করণীয় , টনসিলের জন্য কোন এন্টিবায়োটিক ভালো , টনসিল ফোলা কমানোর ঔষধ , ঢোক গিলতে গলা ব্যথা কেন হয় , দ্রুত গলা ব্যাথা কমানোর ওষুধ  ইত্যাদি প্রশ্ন লিখে অনেকে উত্তর জানতে চান। যা এই ওয়েবসাইটে রোগসমূহ ক্যাটাগরির অন্যান্য পোস্টে সুন্দর করে সকলের জন্য সহজবোধ্য করে উত্তর দেওয়া আছে। আপনি চাইলে সে পোস্টগুলো পড়ে নিতে পারেন। ধন্যবাদ।

আরো পড়ুনঃ

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ১

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ২

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ৩

ডা. মো. ইয়াছিন আহমেদ শরীফ । সিরিয়ালঃ ৪